একজন আদর্শ স্বামীর গল্প
আমার শ্বশুর বেঁচে ছিলেন ৫৮ বছর।
শ্বাশুড়ির সাথে সংসার তার ২৯ বছরের।
এই ২৯ বছরে আমার শাশুড়ীর সুখ, আস্থা, স্বস্তির জায়গা ছিল ওই একটা মানুষই - শশুড়।
আমি বাবাকে দেখিনি। শুনেছি উনার সম্পর্কে হাজারো গল্প।
এক সন্ধ্যায় মা আর আমি বসে চা খেতে খেতে বাবাকে নিয়ে গল্প করছিলাম। মা বলছিলেন -
"যখন আমার বিয়ে হয় তখন বিয়ে কি এইটা বুঝিইনা আমি। তখন শশুরবাড়িতে নিয়ে গেল; আমি খালি খেলতাম। তোমার দাদী বকতো, কি বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করে আনছে খালি সারাদিন খেলে, কাজকর্ম কিচ্ছু পারেনা!
তোমার বাবা তো তখন বড়। সব বুঝতো। কখনো কিছু বলতোনা। কখনো বকাঝকা করতোনা।
আস্তে আস্তে বড় হইলাম, আসিফ, আকিব হইলো। আমার আদর কমলোনা, বরং দিনদিন বাড়তেই থাকলো।
প্রতিদিন সকালে উঠে আগে উনার কাজ কি ছিল জানো? উঠে নামাজ পড়ে ঘর ঝাড় দিত, ফিল্টারে পানি দিত, রাতের যেসব বাসন কোসন জমতো; সব ধুইতো, তারপর ভাত বসাইতো দুপুরের জন্য, ভাত বসায়ে গোসলে যাইতো, যেয়ে বাথরুম ভালোমতো পরিষ্কার করতো, আসিফ আকিবের জামাকাপড় ধুয়ে দিতো, গোসল করে উঠতে ৯/৯.৩০ টা বাজতো। আমাকে আস্তে আস্তে ডাকতো, "আসমা, আসমা... উঠো, চা বসায়ে দাও, আমি বাইরে থেকে নাস্তা আনতেছি।"
সকালে ডাকতোনা, কারণ সকালে ঘুম ভাঙলে আমার মাথা ব্যথা করতো। বাসন কোসন সব ধুয়ে দিত কারণ আমার হাতে যেন ঘা না হয়।
কখনো মাছ না কেটে আনতোনা, ছোটো মাছ আনলে সে নিজেই সবসময় কুটতো৷ শাক, লতাপাতা সবসময় এনে আগে কুটে ফেলতো।
মানুষটা সব কাজ ভালোবেসে করতো। যতটা পারতো, আমার কষ্ট কমায়ে দিতো।
উনি বাইরে যাওয়ার আগে ৩-৪ টা বোতলে ফিল্টারের পানি ভরে দিয়ে যাইতো, কারণ সে এসে দেখবে আমি সারাদিন কতটুকু পানি খাইলাম। আমি পানি কম খাইতাম, সেজন্য।
একটু জোরে আমার সাথে কথা বললে আমি রাগ করে থাকতাম। রাতে চুপিচুপি আসতো, হাতে একটা আইসক্রিম আনতো, বলতো, "তুমি না আইসক্রিম পছন্দ করো, তোমার জন্য আনছি, খাও, আসিফ আকিবরে দেখাইওনা, একটাই আনছি।"
কতটা যে মায়া করতো!
একবার ঈদে সব শপিং করা শেষ, টাকাও শেষ। আমার আসার সময় একটা থ্রিপিস পছন্দ হয়ে গেল। টাকা তো সাথে নাই, সব শেষ। আমার তো মন খারাপ। তোমার বাবা কি করলো, দোকানদারকে তার মোবাইল, ঘড়ি সব জিম্মা করে দিয়ে বলে, "ভাই এইগুলা রাখেন, তবুও এই থ্রিপিসটা দিয়েননা কাউকে। আমি এসে টাকা দিয়ে এটা নিয়ে যাবো৷ দোকানদার বুঝতে পারছে ভালো লোক, বলে, "না ভাই সমস্যা নাই, থ্রিপিস নিয়ে যান। টাকা দিতে হবেনা। এখন তো অনেক রাত, কালকে সকালে টাকা দিয়েন। নিয়ে যান।" পরদিন সকালে তোমার বাবা টাকা দিয়ে আসছে।
আমি কিছু চাইছি আর সে দেয়নাই এমন নজির নাই।
আরেকবার কি হইছে জানো?
আকিবের স্কুল থেকে পিকনিক ছিল সাভার। আমি নিয়ে গেছি ওকে। আমি তো চিনিনা ওই সাইডটা। আসার সময় বাসে উঠছি। দেখি একটু পরে বাস ফাঁকা হয়ে গেলো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আর বাস জ্যামে আটকে আছে। আমি তো নেমে যে অন্য বাসে যাবো এটাও তো চিনিনা। টেনশনে আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করছে। কান্না করবো করবো এমন অবস্থা। এমন সময় হঠাৎ করে বাসের জানালায় তোমার বাবা নক করতেছে আর বলতেছে, "এই আসমা, আসমা... নামো নামো। আমি আসছি।"
মানুষটা কতটা ভালোবাসলে সব বাস চেক করতে করতে করতে আমাকে খুঁজে পাইতে পারে!!
আমি মাঝে মাঝে উনাকে বলতাম, "আপনি তো আমার জন্য পারফেক্ট, কিন্তু আমি তো আপনার জন্য পারফেক্ট হইতে পারলামনা।" তখন বলতো, "কেন আমি কি কখনো তোমারে কিছু বলছি! তুমি যেমন, তেমনই আমার কাছে ভালো।"
এত এত আদর করা মানুষটারে ছাইড়া এখন একা কেমন করে থাকি! চলে গেছে.. একা করে গেছে আমারে।"
মা'র চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পরতে থাকে। আর আমার তার চোখ থেকে পানি মুছে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কি এক অস্বস্তি আটকে রাখে আমাকে।
সবশেষে আমি মনে মনে শুধু বলি, আমি কোনো স্বর্গীয় প্রেম দেখিনি, শুনেছি এক গল্প।
তুমি সারা দুনিয়ার কাছে যেমন মানুষই হও না কেন কিন্তু স্ত্রীর কাছে যদি উত্তম হতে না পারো তবে তোমার দুনিয়ায় আসাটাই মিথ্যে। কিন্তু আমাদের সমাজের অধিকাংশ পুরুষ ই নারীদের সম্মান করে না। একটা মেয়ে তার রূপ, যৌবন, শক্তি, সামর্থ্য সব ব্যায় করে একটা পরিবারের পিছনে বিনিময়ে শুধু একটু সহানুভূতি আর ভালোবাসা চায়।খুব তো বেশি কিছু নয়।তবুও আমাদের হাজারো অভিযোগ ওই মানুষটির প্রতি।
চিরাচরিত এসব স্বভাব ভুলে আসুন না সবাই অর্ধাঙ্গী মানুষটার প্রিয় মানুষ হয়ে উঠি।তার মনের খুশিটার দায়িত্বটুকু নেই। বিনিময়ে আপনি দুনিয়ার বুকেই পাবেন এক টুকরো জান্নাত। আর পরকালের জন্য অফুরন্ত নিয়ামত ইনশাআল্লাহ।

No comments:
Post a Comment